তাজা খবর
মহানবী (সা.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো

মহানবী (সা.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘ভূপৃষ্ঠের সব কিছুই ধ্বংসশীল, একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া। (সুরা আর রাহমান : ২৬-২৭) আরো ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (আলে ইমরান : ১৮৫)

অন্যত্র ইরশাদ করেন, ‘আর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে। যখন তাদের মেয়াদ এসে যাবে, তখন তারা না এক মুহূর্ত পিছে যেতে পারবে, আর না এগিয়ে আসতে পারবে।’ (সুরা আল আরাফ : ২৪, সুরা ইউনুস : ৪৯) কাজেই নবী-রাসূলদেরও মৃত্যুবরণ করা বিধিবদ্ধ।

নবী-রাসূলদের ওফাত : নবী-রাসূলরা যেহেতু মানুষ ছিলেন, সেহেতু তাঁদের মৃত্যু হওয়া স্বাভাবিক।

নবীজীর পৃথিবী থেকে চলে যাবার বিষয়টি অনেকের জন্যেই অসহনীয় কষ্টের ব্যাপার ছিল। কেননা নবীজী ছিলেন আল্লাহর মনোনীত সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, সর্বোত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ। তিনি খুব কম সময়ের মধ্যে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন এবং ন্যায়নীতিময় একটি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করে সর্বস্তরের মানুষের জন্যে যথার্থ কল্যাণ বয়ে আনেন। পৃথিবীর সব মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই কল্যাণ-আদর্শ থেকে উপকৃত হয়।

ওফাতকালীন অবস্থা : রাসূলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ অবস্থায় একদা আপন গোত্রের লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘হে নবীর কন্যা ফাতেমা এবং হে নবীর ফুফু সাফিয়া! নেক কাজ করো, নেক কাজ করো, আমি তোমাদের আল্লাহর হাত থেকে বাঁচাতে পারব না।’

ধীরে ধীরে রোগযন্ত্রণা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। একদিন তিনি হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে কিছু স্বর্ণমুদ্রা জমা রেখেছিলেন।

তিনি তীব্র রোগযন্ত্রণার মধ্যেও বলেন, ‘আয়েশা! সেই স্বর্ণমুদ্রাগুলো কোথায়, যা আমি তোমার কাছে জমা রেখেছিলাম? আমি কি আল্লাহর সঙ্গে এ অবস্থায় মিলিত হব যে আমার ঘরে স্বর্ণমুদ্রা। এগুলো বিতরণ করে দাও।’

রোগযন্ত্রণা কখনো বৃদ্ধি পাচ্ছিল আবার কখনো হ্রাস পাচ্ছিল। ওফাতের দিন সোমবার তিনি অনেকটা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, তিনি তত ঘন ঘন বেহুঁশ হতে থাকেন। এ অবস্থায় তাঁর পবিত্র জবানে উচ্চারিত হতে থাকে—তাঁদের দলভুক্ত করুন, আল্লাহ যাঁদের প্রতি অনুকম্পা করেছেন।

কখনো বলতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি মহান বন্ধু!’ আবার কখনো বলতে থাকেন, এখন আর কেউ নেই, তিনিই মহান বন্ধু। এ কথাটি তিনবার উচ্চারণ করেন। তখন তাঁর পবিত্র আত্মা প্রিয় বন্ধু আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যায়।

মহানবী (সা.)’র ওফাতের ওফাতের সময় ছিল ১১ হিজরি, মাসটি ছিল রবিউল আউয়াল, আর তারিখ ছিল ১২, দিনটি ছিল সোমবার, সময় ছিল চাশত নামাজের শেষ, বয়স ছিল ৬৩, ওফাতের স্থান হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরা—তাঁর কোল।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত হলো, আমার কোলে রাসুল (সা.) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তাঁর মুখের লালার সঙ্গে আমার মুখের লালা একত্রিত হয়েছে।’

ঘটনাটি হলো, আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রাসূল (সা.)-এর কাছে একটি মিছওয়াক হাতে নিয়ে এসেছিলেন, রাসূল (সা.) বারবার মিছওয়াকের দিকে তাকাতে দেখে হজরত আয়েশা বলেন, ‘আপনি কি মিছওয়াক করবেন?’ তখন তিনি মাথা মোবারক নেড়ে সম্মতি জানালে হজরত আয়েশা (রা.) একটি মিছওয়াক নিয়ে মুখে চিবিয়ে নরম করে রাসূল (সা.)-কে দেন। তিনি সেই মিছওয়াক দিয়ে মিছওয়াক করেন। আরো নেয়ামত হলো, তাঁর হুজরায় রাসুল (সা.) সমাহিত হন, তাঁর পবিত্রতায় কোরআনের আয়াত নাজিল হয় এবং তিনিই রাসূল (সা.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

মহানবী (সা.)’র ওফাতের মুহূর্তে সকলেই মনে করতে লাগলেন- কী যেন তার নেই, কী যেন সে হারিয়ে ফেলেছে, কোথায় যেন শূন্য হয়ে আছে। আকাশ-বাতাস থমকে আছে। পশু-পাখি বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এই মুহূর্তটি রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার অপরাহ্নের। মদিনার সর্বত্র অস্ফুট আর্তনাদ রাসূল নাই, রাসূল নাই।

হযরত মুহম্মদ (সা.) এর ইন্তেকালের সংবাদে হযরত ওমর বিহ্বল হয়ে বিবি আয়েশা (রা.) গৃহে প্রবেশ করে হযরতের দেহাবরণ উন্মুক্ত করে একদৃষ্টে মুখপানে তাকিয়ে রইলেন। সেই প্রশান্ত জ্যোর্তিময় মুখখানি দেখে হযরত ওমর কিছুতেই মনে করতে পারলেন না যে, রাসূল (সা.) দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন।

হযরত ওমর (রা.) বলে উঠলেন, ‘কে বলে হযরত নাই? মিথ্যা কথা। হযরত মরেন নাই- মরতে পারেন না।’ রাসূল (সা.) এর মৃত্যুতে হযরত ওমর অতিমাত্রায় বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তখন গৃহদ্বারে দাঁড়িয়ে সমবেত জনতাকে বলতে লাগলেন : ‘হযরত মরেন নাই, মরতে পারেন না, যে বলিবে তিনি মারা গেছেন তার গর্দান লইব।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি কোষ হতে তরবারি তুলে ধরলেন।

ঠিক এই সময়ে হযরত আবুবকর আসলেন। বিবি আয়েশা (রা.) গৃহে প্রবেশ করে রাসূল (সা.) এর মুখাবরণ তুলে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন এবং ভক্তিভরে রাসূলের ললাটে বার বার চুম্বন দিতে লাগলেন।

আর অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, ‘জীবনে যেমন সুন্দর ছিলেন, মরনেও আপনি ঠিক তেমনি সুন্দর।’ তারপর দু’হাতে মহানবীর মস্তক কিঞ্চিৎ উত্তোলন করে পুনরায় ধীরে ধীরে শোয়াইয়া দিয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রিয় বন্ধু, আপনি আজ সত্যিই আমাদেরকে ছেড়ে গেলেন।’

গৃহ থেকে বের হয়ে হযরত ওমরকে তরবারি হাতে দণ্ডায়মান দেখে হযরত আবুবকর বললেন, ওমর কী করিতেছ? ক্ষান্ত হও। হযরত মারা গেছেন, এতে আশ্চর্যের কী আছে? আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলের কাছে এই আয়াত নাযিল করেছিলেন- ‘নিশ্চয়ই তুমি মরিবে এবং তাহারাও (অন্য লোকেরাও) মরিবে।’

তাছাড়া ওহুদ যুদ্ধের পর আল্লাহ তায়ালা বলেছিলেন, ‘মুহম্মদ একজন প্রেরিত নবী ছাড়া কিছুই নহে। নিশ্চয়ই তাঁর পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীরা ইন্তেকাল করেছেন। এক্ষেত্রে কী করিবে? তিনি যদি মারাই যান, অথবা নিহতই হন, তবে কি তোমরা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া যাইবে?’ অতএব হে লোক সকল অবহিত হও, মুহাম্মদ (সা.) মারা গেছেন। একমাত্র আল্লাহর মৃত্যু নেই, তিনি চিরজীবন্ত।

হযরত আবুবকরের এই জ্বলন্ত সত্যবাণী শুনে হযরত ওমরের জ্ঞান ফিরে এলো। তিনি নতুনভাবে উপলব্ধি করতে লাগলেন। এ সময় থর থর করে কাঁপতে ছিলেন হযরত ওমর (রা.)। তখন তার হাত থেকে তরবারি খসে পড়লো এবং তিনিও মাটিতে পড়ে গেলেন।

মহানবী (সা.) এর দেহখানি চব্বিশ ঘণ্টা রেখে মঙ্গলবার অপরাহ্নে দাফন করা হয়। এই সময়ের মধ্যে বহু দূরদূরান্ত থেকে বৃদ্ধ, যুবক, স্ত্রী, বালক, বালিকা কাতারে কাতারে মদিনা পানে ছুটে আসেন। সকলেরই মুখ ছিল মলিন, চোখে ছিল পানি, কণ্ঠে ছিল হাহাকার ধ্বনি। মদিনার সর্বত্র ছিল শোকের মাতম।

রাসূল (সা.) এর দাফন নিয়ে মতভেদের সৃষ্টি হয়েছিল। কারো কারো প্রস্তাব ছিল মসজিদুল নববীর মিম্বরের পাশে। কেউ কেউ বলছিলেন মিম্বরের নিম্নে। কিন্তু হযরত আবুবকর কারো প্রস্তাব গ্রহণ না করে বলতে লাগলেন জীবিতকালে রাসূল (সা.)কে বলতে শুনেছি : ‘পয়গাম্বরেরা যেখানেই দেহত্যাগ করেন সেখানেই তাহাদের সমাহিত করতে হয়। অতএব হযরত যেখানে শায়িত আছেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করতে হবে।’

মদিনায় তখন অগণিত লোক। মহানবীকে সমাধি-শয়নে শায়িত করার পূর্বে হযরত আবুবকর সবার তরফ থেকে মোনাজাত করলেন : ‘হে রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর অনন্ত রহমত আপনার পবিত্র আত্মার ওপর বর্ষিত হউক। আমরা সাক্ষ্য দিতেছি, আপনি আল্লাহর বাণী যথাযথভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন; যতদিন না সত্য জয়যুক্ত হয়েছে, ততোদিন জীবনপণ করে জিহাদ করেছেন।

এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই- একথা আপনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে আমাদেরকে টেনে এনেছেন; বিশ্ববাসীদের প্রতি আপনি চিরদিনেই সদয় ব্যবহার করেছেন, আল্লাহর ধর্ম সবার দুয়ারে পৌঁছে দেবার বিনিময়ে আপনি কোনোদিন কোনো প্রতিদান চাননি, অথবা ধর্মকে কারো কাছে বিক্রিও করেননি। হে দরদী বন্ধু, আল্লাহর অনন্ত করুণায় আপনার রূহ-মোবারক অভিষিক্ত হোক। আমিন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*