তাজা খবর
চট্টগ্রামে সুরের তরঙ্গে ভাসল গানের সাম্পান

চট্টগ্রামে সুরের তরঙ্গে ভাসল গানের সাম্পান

‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/ এই অপরূপ রূপে বাহির হলেন জননী/ ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে/ ওগো মা…।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান যখন গাইছিলেন শিল্পী অদিতি মহসিন, তখন সাইড স্ট্ক্রিনে ভেসে আসছিল অপরূপ বাংলার নানা ছবি। আবার ‘ওরে সাম্পানওয়ালা তুঁই আমারে করলি দিওয়ানা’ গানটির যখন সুর তুললেন রন্টি দাশ, তখন স্ক্রিনে ঢেউ তুলল কর্ণফুলী নদী। বাংলাদেশ ও চট্টগ্রামকে এভাবে একসুরে গেঁথেই এইচএসবিসি (হংকং-সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন) আয়োজন করেছে এক স্বর্ণালি সংগীতসন্ধ্যার। চট্টগ্রামের হোটেল র‌্যাডিসনের মেজবান হলে ‘গান হয়ে এলে’ শিরোনামে এ আয়োজনে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস। বরেণ্য চিত্রাভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী এই অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করলেন তার বেড়ে ওঠার দিনগুলোর কথা। চট্টগ্রামের জনপ্রিয় বিভিন্ন গান দিয়ে অনুষ্ঠানকে নতুন রঙে রাঙিয়েছেন বরেণ্য শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন, সামিনা চৌধুরী, পার্থ বড়ূয়া, অদিতি মহসিন, রন্টি দাশ ও সাব্বির।

এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রাঁসোয়া দ্য মেরিকো এবং উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব-উর-রহমান অনুষ্ঠানে অতিথিদের স্বাগত জানান। ‘গান হয়ে এলে’ শিরোনাম নিয়ে কেন তারা চট্টগ্রামে এলেন বলেছেন তার নেপথ্যের গল্পও। ফ্রাঁসোয়া দ্য মেরিকো তার বক্তব্যের শুরুতে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির শহর। এখানে বন্দর আছে। আছে কীর্তিমান অনেক মানুষও। ঐতিহ্যের সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরতেই এমন আয়োজন।’

মাহবুব-উর-রহমান তার বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভাষার সংগ্রামে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরিহার্য এক নাম চট্টগ্রাম। এটা বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন, বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শহর। এটা শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের শহর। কিংবদন্তি চিত্রনায়িকা কবরীর শহর। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী প্রবাল চৌধুরীর জন্মও এই শহরে। তাই আমরা চট্টগ্রামে এসেছি। সংস্কৃতির মাঝে ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ হবে আজ।’

কবরী মঞ্চে ওঠেন ৮টা ৪৫ মিনিটে। শিল্পী সামিনা চৌধুরীর গানের মাঝেই মঞ্চে আসেন মিষ্টি মেয়েখ্যাত কবরী। মঞ্চে উঠেই তিনি ‘স্মৃতিটুকু থাক’ বই থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনান। কথা বলেন চট্টগ্রামে তার বেড়ে ওঠা নিয়েও। গান প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম সংগীতের দিক দিয়ে অনেক বেশি ঐতিহ্যময়। এখানকার মাইজাভান্ডারি গান, আঞ্চলিক গান সারা বিশ্বে সমাদৃত। এখানে আছে হালদা ফাডা গান। এটি উত্তর চট্টগ্রামের হালদা নদীর নামানুসারে হয়েছে। নৌকা-সাম্পানের মাঝিরা নদীতে সাম্পান বেয়ে যাবার সময় এই গান গাইতেন। এইচএসবিসির এমন আয়োজন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা ৭টা ছুঁতেই মঞ্চে ওঠেন উপস্থাপক সৈয়দ আপন আহসান। শুরুতেই তিনি জানালেন এ আয়োজনের নেপথ্যের কথা। চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী ও গান কীভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে বললেন সেই কথাও। এর পরেই উদ্বোধনী সংগীত নিয়ে আসেন অদিতি মহসিন। তিনি একে একে গাইলেন তিনটি গান-আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে, আনন্দধারা বহিছে ভুবনে ও সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে।

সাবিনা ইয়াসমিনও গানের আগে চট্টগ্রামের লোকজ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান কতটা শক্তিশালী সেটি তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন বলে মন্তব্য করেন। ‘সব ক’টি জানালা খুলে দাও না’ গেয়ে তিনি সবাইকে বিমোহিত করেন।

শিল্পী শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান গেয়ে শোনান রন্টি দাশ ও সাব্বির। ‘৭০ ও ৮০-এর দশকে কবরী অভিনীত সিনেমার জনপ্রিয় কয়েকটি গানও গেয়ে শোনান তারা। এরই ফাঁকে মঞ্চে আসেন প্রয়াত শিল্পী প্রবাল চৌধুরীর ছেলে মানস চৌধুরী। তার বাবার জনপ্রিয় কয়েকটি গান মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছে সেই গল্প শোনান মানস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*