দেশজুড়ে

গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার

রাজধানীতে বেসরকারি চার হাজারের বেশি বাস চলাচল করে। এটা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য। এর বাইরেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার (বিআরটিসি) বেশ কিছু বাস সাধারণ যাত্রী পরিবহন করে। নগরীতে চলা বাসের প্রতিটিতে নারীদের জন্য মাত্র নয়টি আসন সংরক্ষিত থাকে।

২০১৮ সালে দোলনচাঁপা নামের একটি বেসরকারি পরিবহন প্রতিষ্ঠান নারীদের জন্য চারটি বাস চালু করে। কিন্তু ২০২২ সালে ২৩ অক্টোবর সেই পরিবহনের বাসও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে বিআরটিসি বাস ছাড়া নারীদের জন্য সড়কে আর কোনো বাস নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়। ২০০১ সালে এই সেবা ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রসারণ করা হয়। এরপর প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এই সেবা।

এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ২০০৯ সালে আবার এই সেবা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বিআরটিসির পাশাপাশি পরিবহন সংস্থা দোলনচাঁপা যাত্রা শুরু করলেও সেটিও প্রায় চার বছরের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, যাতায়াতের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিনিয়ত বাধা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক পরিচালিত ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্য কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সেইসঙ্গে বাসের হেলপাররা মাঝেমধ্যেই নারী যাত্রীদের বাসে উঠতে বাধা দেয়। এতে করে নারী যাত্রীরা বাসে যাতায়াত করার সময় নানা সমস্যায় পড়েন।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা মরিয়ম মীম বলেন, ‘শহরে নারীদের জন্য বাস এখনো চোখে পড়েনি। আর যেসব বাস আছে সেগুলোতে নারীদের জন্য যে নয়টি আসন সংরক্ষিত থাকে, সেখানেও পুরুষ যাত্রীদের বসে থাকতে দেখা যায়। সেইসঙ্গে রাত ৮টার পর অনেক বাসে নারীদের উঠতে দিতে চায় না বাসের হেলপাররা।’

মিরপুরের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘এ রুটে নারীদের জন্য বিআরটিসির একটি বাস মাঝেমধ্যে দেখা যায়। তবে পর্যাপ্ত বাস না থাকায় বেশিরভাগ সময় ওঠা হয় না। তাছাড়া নগরীতে যে বাসগুলো চলে সেগুলো নারী যাত্রীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। যার জন্য বাসে চলাচল করার সময় প্রতিনিয়ত আমাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারের উচিত নারীদের জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে আরও বাস নামানো।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, একটি আদর্শ শহরে নারীদের জন্য বাস থাকা খুবই দরকার। কিন্তু এত বড় শহরে নারীদের জন্য বাস নেই বললেই চলে। কৌশলগত নানা সমস্যা সমাধান না করতে পারায় নারীদের জন্য বাস সড়কে টেকে না। অথচ নারী যাত্রী যারা আছেন তাদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বাসে চলাচল করতে হয়। বাসে চলাচল করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘নারীদের জন্য বাস সেবা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। সেজন্য সড়কে যে বাস নামানো হয় সেগুলোও বন্ধ হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মাঝেমধ্যে কিছু ভালো উদ্যাগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো টেকসই না হওয়ায় আলোর মুখ দেখে না। নারীদের জন্য বাসের ক্ষেত্রে এটা খাটে। কারণ কিছুদিন চলার পর দেখা যায় নারীদের জন্য নামানো বাসগুলো বন্ধ হয়ে যায়। নারীদের জন্য আলাদা বাস সেবা চালু করার পর সেটা ধরে রাখাটা বড় চ্যালেঞ্জ।

তাছাড়া নারীর জন্য বাস নামানোর আগে রুটগুলো আলাদাভাবে ভাগ করা দরকার। একই সঙ্গে বাসের চালক থেকে হেলপার সবাই যদি নারী হয় তাহলে বিষয়টি আরও বেশি ভালো হবে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘নারীদের জন্য চালু করা বাসগুলো রঙভিত্তিক করা দরকার। যেন দূর থেকে সবাই চেনে সেটি নারীদের বাস। আর প্রথম দিক থেকে যাত্রী কম পেলেও যখন বাসের সংখ্যা বেড়ে যাবে, বাস ও গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে যাতাযাতের বিষয়টি সবাই দেখতে পাবে তখনই এর চাহিদা বেড়ে যাবে।’

তিনি মনে করেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিআরটিসির মাধ্যমে আরও বাস নামানো দরকার। কারণ নগরীতে নারী যাত্রীদের নানা হয়রানির শিকার হতে হয় গণপরিবহনে চলাচলের সময়।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লোকসান হলেও নারী যাত্রীদের জন্য নয়টির মতো বাস সড়কে চলছে। কিন্তু যে বাসগুলো চলে সেগুলোও যাত্রী পায় না। চাহিদা থাকলে আরও বাস নামানো হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *