চট্টগ্রাম

ঋণের টোপ, গরিবের টাকা মেরে উধাও ‘একতা’

বৃদ্ধ সাইদুল আকতারের পারিবারিক কাজে দরকার ছিল ৫ লাখ টাকা। পরিচিত লোকের মুখে শুনে তিনি দারস্থ হন একটি সমিতিতে। সঞ্চয় হিসাব খুলে ৭০ হাজার টাকা জমা রাখলেই মিলবে ৫ লাখ টাকা ঋণ— এমন আশ্বাসে টাকাও জমা দেন। কিন্তু ঋণের টাকা দেওয়ার দিনে এসে দেখতে পান সমিতির কার্যালয়ে তালা। উধাও প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষরাও।

শুধু সাইদুল আকতার নন, একতা শ্রমজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে ওই সমিতির প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে এখন নিঃস্ব চট্টগ্রামের ইপিজেড থানা এলাকার গার্মেন্টস শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের প্রায় আড়াইশ গ্রাহক। আর কোটি কোটি টাকা মেরে নিজের আখের গুছিয়ে গত দুইদিন ধরে লাপাত্তা সমিতির মালিক মো. রাসেল।

মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে সরেজমিনে নগরের ইপিজেড থানার বিপরীতের ১ নং নেভী ওয়েলফেয়ার মার্কেটের দ্বিতীয় তলার ওই সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের শাটারে তালা ঝুলছে। শাটারের বাইরে ঝুলছে একটি সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে সমিতির রেজিস্ট্রেশন নং উল্লেখ করা-১২৫৯৯। আর সমিতি কার্যালয়ের সামনেই শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করেছেন। টাকা খুঁইয়ে তাদের মধ্যে অনেকেই কপালে হাত চাপড়ে আহাজারি করছেন।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুঁটে এসেছেন সুমি নামে এক নারী গ্রাহক। তিনি বলেন, ‘আমি সমিতিতে সঞ্চয় করেছিলাম ৬০০ টাকা ফি দিয়ে। আমার ৮ লাখ টাকা জমা সমিতিতে। গতকাল শুনেছি সমিতির মালিক পালিয়েছে আমাদের টাকা নিয়ে। গার্মেন্টস এ চাকরি করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকাগুলো জমিয়েছি। এই টাকা যদি না পাই আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া পথ থাকবে না। আমার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েও আছে। কিছু একটা করেন ভাই’।

মোহাম্মদ আবু বকর নামে এক গ্রাহক বলেন, ‘সমিতিতে অ্যাকাউন্ট করার সময় সঞ্চয় নিয়েছিলো ৬০০ টাকা। আবার ভর্তি ফি’র নামে নিয়েছে ১শ টাকা। আমি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিতে চেয়েছিলাম সমিতি থেকে। সেই বাবদ ঋণ ফি দিয়েছি ৫ হাজার ৮৮০ টাকা।’

সমিতির কার্যালয়ের নিচতলায় বসে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় নিউমুরিং এলাকার বাসিন্দা মো. আব্বাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘আমার ৮০ হাজার টাকা জমা ছিল। পরশুদিন (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে আমাকে ঋণ দেওয়ার কথা ছিলো। আমাদের গলির প্রায় ৩০ জনের ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত ওই সমতিতে জমা আছে। যাদের বেশিরভাগই নিম্ন আয়ের। আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। যেন তারা অতিদ্রুত রাসেল নামে ওই বাটপারকে গ্রেপ্তার করে।’

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, রাসেল পালানোর আগেরদিন রাতে ঘড়ির দোকান থেকে ঘড়ি, চশমার দোকান থেকে কয়েকটি চশমা, জামা-কাপড়ের দোকান থেকে কয়েক সেট পোশাক এবং মুদির দোকান থেকে বাকিতে বাজার নিয়েছিলেন। সবশেষ তারা বাজার করতেই দেখেছিলেন তাকে।

জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে ইপিজেড থানার বিপরীত পাশের নেভী ওয়েলফেয়ার মার্কেটে সমিতি খোলে বরিশালের ঝালকাঠি জেলার মো. রাসেল নামে এক ব্যক্তি। এরপর তিনি সমিতিতে কাজ করার জন্য নিয়োগ দেন বেতনভুক্ত অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী। মূলত কর্মকর্তারা কার্যালয়ে বসে টাকার হিসাব এবং গ্রাহকদের সঞ্চয় পরিচালনা করতেন। আর কর্মচারীরা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে শ্রমজীবী মানুষদের ‘মগজধোলাই’ করে গ্রাহক টানতেন।

গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত ঋণ নিতেই এই সমিতিতে সঞ্চয় হিসাব খুলেছেন বেশিরভাগ গ্রাহক। প্রতি লাখ টাকা ঋণের জন্য ১১ হাজার ৩শ’ টাকা নেওয়া হতো সমিতি থেকে। এরপর ঋণ দেওয়ার তারিখ দিলেও তালবাহানা করতো সমিতির কর্মকর্তারা।

পুলিশ এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী— অন্তত ৩০০ গ্রাহক আছে ওই সমিতির। আর এসব গ্রাহকদের জমা ছিলো কমপক্ষে ২ কোটি টাকা। এদিকে, গত ৩ মাস ধরে সমিতির ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতনের আনুমানিক ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি রাসেল। সব টাকা নিয়েই গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চম্পট দিয়েছেন সমিতির এই কর্ণধার।

সমিতিতে কাজ করা একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘আমরা ভাই বেতনের আশায় কাজ করেছি। এসব তো আমরা জানতাম না। আমাদের প্রত্যেকের গত ৩ মাসের বেতনও বাকি। আমরাও পরিবার নিয়ে বিপদে পড়েছি বেতন না পেয়ে।’

এদিকে, টাকা মেরে পালানো রাসেলকে ধরতে কাজ করছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, যত দ্রুত সম্ভব অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

ইপিজেড থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা আফসার উদ্দিন রুবেল সিভয়েস২৪-কে বলেন, ‘সাইদুল আকতার নামে একজন গ্রাহকের অভিযোগ আমরা পেয়েছি। মূলত গার্মেন্টস শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের টার্গেট করে এই সমিতি থেকে ঋণ দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে তদন্ত করে মো. রাসেল নামে একজন জড়িত থাকার কথা জেনেছি। যিনি সমিতিটির মালিক পরিচয় দিতেন। সমিতির লাইসেন্সও তার নামেই করা। আমরা তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। তাকে আটক করা গেলে এর সাথে আরও কেউ সম্পৃক্ত কিনা তা জানা যাবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *