চট্টগ্রাম

বংশ পরম্পরায় টিকে আছে কারচুপি কাজ

কাঠের ফ্রেমে টান টান করে আটকানো নতুন কাপড়। তাতে একমনে পুঁতি, জরি, চুমকি, স্প্রিং আর রঙিন সুতোয় ফুটিয়ে তুলছেন বাহারি নকশা।দুই হাতে কাজ করছেন সমানে। মালিক-শ্রমিক কারও কথা বলার ফুরসত নেই। তাড়া একটাই, নির্দিষ্ট সময়ে বুঝিয়ে দিতে হবে অর্ডার।

নগরের খুলশীর ঝাউতলা বিহারি পল্লির জারদৌসি, কারচুপি কাজের কারখানাগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে। এখানে শাড়ি, ত্রিপিস, বোরকা, লেহেঙ্গা, পাঞ্জাবিতে গ্রাহকের দেওয়া নকশা অনুযায়ী হাতের কাজ করে দেন বংশ পরম্পরায় দক্ষ কারিগরেরা।

৩০ বছর ধরে কারচুপির কাজ করছেন মো. আরমান (৪৩)। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমার ওস্তাদ মোহাম্মদ শাহিদ। ১০-১২টি কাঠের ফ্রেমে ৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন। সকাল ১০টা থেকে কাজ শুরু, চলে সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত। আবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ২টা কিংবা সেহেরির আগ পর্যন্ত কাজ চলে। গ্রাহকের দেওয়া ডিজাইন, ইন্টারনেট থেকে ডিজাইন ডাউনলোড করে আমরা ট্রেসিং পেপারে নকশা তুলে নিই। তারপর কারচুপির কাজ করি। কাজের ধরন বুঝে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা মজুরি নিয়ে থাকি আমরা।

তিনি জানান, শবে বরাতের পর থেকে ঈদের কাপড়ের কাজের অর্ডার বাড়ছে। ১৫ রমজানের পর আর অর্ডার নিতে পারবো না।

মো. আন্নু ৮ হাজার টাকা মাসিক বেতনে এ কারখানায় কাজ করছেন। তিনি জানান, সারা বছর কারচুপির কাজ চলে বোরকা, শাড়িতে। ঈদের আগে ত্রিপিস, পাঞ্জাবির অর্ডার আসে বেশি।

বিহারি পল্লিতে দুই পাপ্পু কারচুপির কাজে বেশ প্রসিদ্ধ। একজন মো. খালেদ জাফর (পাপ্পু)। তিনি ২৬ বছর ধরে কাজ করছেন। তার অধীনে আছেন ৪ জন কারিগর। বাংলানিউজকে এ পাপ্পু বলেন, অর্ডার আগের চেয়ে কম। হয়তো মানুষের হাতে টাকা কম। তবে আগের চেয়ে সহজ হয়েছে ডিজাইন। হাজার নিত্যনতুন ডিজাইন ইন্টারনেটে ছড়িয়ে আছে। ডাউনলোড করে নকশা করে নিলেই হলো। আগে কলম দিয়ে ডিজাইন আর্ট করতে হতো নিজেদের।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখানে ছোট্ট ছোট্ট স্প্রিং দিয়ে যে কাজ করতে হয় তা একটু কঠিন। সুতোর কাজ সহজ। একেকটি ডিজাইনে ৫০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিই আমরা। পুঁতি, জরি, চুমকি, স্প্রিং আর রঙিন সুতো সব আমরাই দিয়ে থাকি। এগুলোর দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, একসময় বিহারি পল্লির ঘরে ঘরে নারীরা কারচুপির এ কাজ করতেন। এখন নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ নারী তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছেন। উত্তরবঙ্গে প্রচুর নারী কাপড়ে কারচুরি কাজ করছেন।

তবে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় এখনো দুই-চারজন নারী কাজ করেন। তাদের একজন রূপা। তিনি জানান, স্থানীয় কারখানায় কাজ করার পর বাসায়ও যাতে কাজ করতে পারি তার জন্য আমি একটি কাঠের ফ্রেম বাসায় বসিয়েছি। স্বাবলম্বী হতে হলে বেশি বেশি কাজ করার বিকল্প নেই।

মো. জাহিদ পাপ্পু কাজ করছেন ২৫ বছর ধরে। তিনি বলেন, রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে দোকানিরা বোরকায় কারচুপির কাজের অর্ডার দেন আমাকে। বোরকার হাত, সামনে পেছনে কাজ করতে হয়। একেকটি বোরকার কাজের জন্য ৬২০, ৬৫০ ও ৭০০ টাকা মজুরি নিই। চার ঘণ্টায় একটি বোরকার কাজ শেষ করতে পারি।

তিনি জানান, পুঁতির একটি প্যাকেট ৫-৬ মাস আগেও ছিল ১৬৫ টাকা। এখন ২৬০ টাকা। ১০০ লহরার খ্রিস্টাল কিনতাম ৭০০ টাকা। এখন তা ১ হাজার ৫৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু আমাদের কাজের দাম বাড়েনি।

নাম প্রকাশ না করে একজন কারখানা মালিক বলেন, বিহারিরা বংশ পরম্পরায় কারচুপির কাজ করে আসলেও বাঙালিরাও এ কাজটি এখন শিখে নিয়েছে। হালিশহর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠছে। কারণ হাতের কাজের কদরই আলাদা। চিন্তার বিষয় হচ্ছে, আধুনিক মেশিনের ভিড়ে কতদিন বাপ-দাদার এ পেশা টিকে থাকবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *